চন্দ্রা ত্রিমহনি এলাকায় বিশাল যানজট।

ঈদকে সামনে রেখে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমহনি এলাকায় আবারও ভোগান্তিতে পড়েছে ঘরমুখো মানুষ। বুধবার (১৮ মার্চ) রাতভর থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ও আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী থেকে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর পর্যন্ত প্রায় পচিশ কিলোমিটার এলাকায় যানবাহন আটকে পড়ে। পাশাপাশি চন্দ্রা-নবীনগর সড়কের জিরানী বাজার পর্যন্ত আরও ০৫ থেকে আট কিলোমিটার এলাকায় ধীরগতিতে গাড়ি চলতে দেখা যায়। বৃষ্টি ছাড়াও চন্দ্রায় যানজটের বিভিন্ন কারণ রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় যাত্রী ও পরিবহন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকটি কারণ মিলেই চন্দ্রা ত্রিমহনি এলাকায় এই দুর্ভোগ তৈরি হয়। তাদের মতে বুধবার বিকালের দিকে একসঙ্গে হাজারের বেশি কারখানা ছুটি হয়। লাখো শ্রমিক বাড়ি ফিরতে বাসস্ট্যান্ডগুলোতে ভিড় জমান। এতে যাত্রীর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। অতিরিক্ত যাত্রীর সঙ্গে সঙ্গে যানবাহনেরও চাপ বাড়ে। পরিবহনগুলোর অনেকেই এ সময় অতিরিক্ত ভাড়াও দাবি করে। এতে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের দরকষাকষিতেও এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়। সেই স্থবিরতা ভোগান্তিতে রূপ নেয় ওইদিন বিকাল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি যা রাতভর থেমে থেমে চলতে থাকে। এতে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে যায় এবং যানবাহনের গতি কমে যায়। ধীরগতিতে গাড়ি চলার ফলে একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
এছাড়া ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের চাপে অনেক যাত্রী নির্ধারিত বাস না পেয়ে ট্রাক বা পিকআপে চড়তে বাধ্য হন। কেউ কেউ কিছু দূর গাড়িতে গিয়ে আবার নেমে হেঁটে অন্য গাড়িতে উঠেছেন। এতে সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও বেড়ে যায়। এছাড়া অনেকেই পুলিশের ব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করেছেন এই ভোগান্তির কারণ হিসেবে।
ধীরগতিতে গাড়ি চলার ফলে একপর্যায়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়
বৃহস্পতিবার সকালে যানজট কিছুটা কমে, এবং বৃষ্টি কমে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। যদিও চন্দ্রা ও আশপাশের এলাকায় এখনও ধীরগতিতে গাড়ি চলতে দেখা যাচ্ছে।
সবমিলিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ, সড়কের অব্যবস্থাপনা ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে চন্দ্রা ত্রিমহনি এলাকায় দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
চন্দ্রা এলাকার বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন,গতকাল প্রায় হাজারের বেশি পোশাক কারখানা ছুটি হয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই যাত্রীদের একটি চাপ তৈরি হয়। বাড়ি ফিরতে অনেকেই ভিড় জমান। যাত্রীর চাপে পরিবহনের চাপও বাড়ে। পরিবহনগুলো অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করায় অনেকেই দরকষাকষি করে সময়ক্ষেপণ করছিলেন। সবমিলিয়ে একটা স্থবিরতা তৈরি হয়। ফলে পরিবহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়।
যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের
অভিযোগ, কয়েক কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লেগেছে। যাদের নির্দিষ্ট বাস ছিল না, এমন অনেক যাত্রী ট্রাক বা পিকআপ থেকে নেমে কিছু দূর হেঁটে, কিছু দূর গাড়িতে গন্তব্যের দিকে রওনা হয়েছেন। আর পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, এক দিনে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপেই দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।
পাবনা যেতে চন্দ্রায় আসা বাবুল নামে এক যাত্রী বলেন, আমি টেক্সটাইল মিলে চাকরি করি। গতকাল ছুটি হয়েছে। আজ বাড়ি যাচ্ছি। দুই ঘণ্টা ধরে দাঁড়িয়ে আছি। অতিরিক্ত মানুষ, ভাড়া বেশি চায়, তাই দেরি। যেমন- আমার ভাড়া ৫০০ কিন্তু চাচ্ছে ১ হাজার। এখনও উঠতে পারিনি।
সখিপুর থেকে চন্দ্রা এসে প্রা
আসমা খাতুন নামে অপর এক যাত্রী বলেন, গতকাল রওনা হওয়ার কথা ছিল কিন্তু বিকালে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বের হইনি। আজ সকালে বের হয়েছি, ভেবেছিলাম যানজট হবে না। তবে আমার ধারণা ভুল, পুরো রাস্তায় যানজট।
যান চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মন্তব্য
বৃহস্পতিবার সকালের দিকে কোনাবাড়ী নাওজোর হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলেন, রাত থেকেই আমরা যানজট নিরসণে কাজ করছি। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সকাল পর্যন্ত চাপ বেশি থাকলেও এখন ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে।
তিনি বলেন, যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা জোরদার করা হয়েছে। আশা করছি, পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১টার দিকে হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর রিজিয়নের গাজীপুর সার্কেলের সিনিয়র এসপি মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন খান বলেন, গতরাতে বৃষ্টির কারণে কিছুটা ঝামেলা হয়েছিল রাস্তায়। বৃষ্টির সময় গাড়ি ধীরগতিতে চলায় সাময়িক যানজট তৈরি হয়। তবে এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, চন্দ্রা-শফিপুর এলাকাসহ গাজীপুরের এই পুরো হাইওয়ে অঞ্চলে আমাদের প্রায় ৩০০ জন সদস্য মোতায়েন রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিকভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন রাস্তা অনেকটাই ফাঁকা। চন্দ্রা থেকে ফায়ার সার্ভিস হয়ে কালিয়াকৈর পর্যন্ত যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। আমি নিজেও সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, গাড়িগুলো দ্রুত গতিতে চলাচল করছে।
তবে সামনে গার্মেন্টস কারখানাগুলো ছুটি হওয়ায় বিকালে আবারও যানবাহনের চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
সিনিয়র এসপি মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন খান বলেন, আজ গার্মেন্টস ছুটি হওয়ার কারণে বিকালে আবার কিছুটা চাপ বাড়তে পারে। আগামীকালও কয়েকটি গার্মেন্টস ছুটি হবে, তাই তখনও যানবাহনের চাপ থাকতে পারে। তবে আবহাওয়া ভালো থাকলে যত গাড়িই আসুক, আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবো।
হাইওয়ে পুলিশের গাজীপুর জোনের পুলিশ সুপার সীমা রানী সরকার বলেন, মহাসড়কে আমরা টানা কাজ করে যাচ্ছি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যেকটা পয়েন্টে পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। গাড়ির অতিরিক্ত চাপ ও পোশাক কারখানা একত্রে ছুটি হওয়ায় ঘরমুখো মানুষের চাপ রয়েছে। যে জন্য ধীরগতি দেখা যায়। এখন পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক।