দুর্ঘটনার পর ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনার ভুক্তভোগীরা আজও পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ পাননি

শেয়ার করুন


ছবি :সংগৃহীত
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা ভবনটি কয়েক মিনিটের মধ্যেই ধসে পড়ে ভয়াবহ এক ট্র্যাজেডির জন্ম দেয়। এতে অন্তত ১ হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক নিহত হন এবং আহত হন হাজার হাজার মানুষ। ওই ঘটনা শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। একইসঙ্গে দেশের গার্মেন্ট খাতের নিরাপত্তা ও শ্রম অধিকার ব্যবস্থার বড় দুর্বলতাও সামনে আনে।
দুর্ঘটনার পর ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই ঘটনার ভুক্তভোগীরা আজও পুরোপুরি ক্ষতিপূরণ পাননি। অনেকে কিছু সহায়তা পেলেও তা ছিল মূলত মানবিক সাহায্য, আইনি ক্ষতিপূরণ নয়—এমনটাই বলছেন শ্রম অধিকারকর্মীরা।
দুর্ঘটনার পর দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে বড় অঙ্কের সহায়তা আসে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রায় ১২৭ কোটি টাকা জমা পড়ে, যার একটি অংশ বিতরণ করা হলেও বড় অংশ এখনও স্পষ্টভাবে নিষ্পত্তি হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সমন্বয়ে পরিচালিত ‘রানা প্লাজা অ্যারেঞ্জমেন্ট’-এর মাধ্যমে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে ৫ হাজারের বেশি ভুক্তভোগীকে সহায়তা দেওয়া হয়। তবে শ্রমিক নেতাদের মতে, এটি কোনও কাঠামোবদ্ধ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা ছিল না, ছিল স্বেচ্ছা অনুদান।
শ্রম আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা এবং স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে আড়াই লাখ টাকা নির্ধারিত। শ্রমিক সংগঠনগুলোর মতে, বাস্তবতার সঙ্গে এটা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ হওয়া উচিত ছিল আজীবন আয়ের ভিত্তিতে, যা রানা প্লাজার ক্ষেত্রে প্রতি শ্রমিকের প্রায় ৪৮ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারতো।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংস্থার সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ‘‘পর্যাপ্ততা নির্ধারণের কোনও স্পষ্ট মানদণ্ড নেই। তবে সময়ের সঙ্গে শ্রমিকদের মজুরি ও জীবনমান কিছুটা উন্নত হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়েছে।”
ভুক্তভোগীরা এখনও সেই ধসের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি। অনেকেই গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন, কেউ আবার কাজ করার সক্ষমতাও হারিয়েছেন। চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে না পেরে অনেকে চরম আর্থিক সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। পরিবার ভেঙে যাওয়া, সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া—এগুলো এখন তাদের নিত্য বাস্তবতা।
শ্রমিক প্রতিনিধিরা বলছেন, শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল শুধু টাকা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মাসিক ভাতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিও ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরেও এসব দাবির বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়নি।
শ্রমিক নেতা খায়রুল মামুন মিঠু বলেন, “শ্রমিকরা যা পেয়েছে, তা দান—ন্যায়বিচার নয়।”
অপরদিকে, প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রক্রিয়াও ধীরগতির। বহু সাক্ষী মারা যাওয়ায় বা নিখোঁজ হওয়ায় মামলার অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। ফলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও দোষীদের শাস্তির প্রক্রিয়া এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ সম্ভব নয়।”
শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যা শুধু রানা প্লাজা নয়, বরং পুরো কাঠামোর। দেশের বিভিন্ন শিল্প দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমিত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে, যা কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। জাতীয় পর্যায়ে একটি সমন্বিত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কাঠামো না থাকায় শ্রমিকরা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন।
এদিকে কিছু উদ্যোগ যেমন কর্মক্ষেত্র দুর্ঘটনা বিমা বা পাইলট সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু হলেও তা এখনও সীমিত পরিসরে রয়েছে এবং বাধ্যতামূলক হয়নি।
১৩ বছর পর রানা প্লাজা তাই কেবল একটি দুর্ঘটনার নাম নয়, বরং এটি হয়ে উঠেছে অসমাপ্ত ন্যায়বিচার, অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং শ্রমিকদের দীর্ঘ অপেক্ষার প্রতীক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *