প্রলম্বিত হচ্ছে কি, পে-স্কেল বাস্তবায়ন

শেয়ার করুন

পে স্কেলের প্রয়োকী ছবি

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সতর্কতার মুখে এখনই তা কার্যকর করছে না সরকার। রবিবার (৫ এপ্রিল) রাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর আলোচনার পর বিষয়টি পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটির ওপর। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকারের এই পদক্ষেপ মূলত সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল।
সচিব কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরতা
অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে পে-কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর তা বাস্তবায়নের আগে কয়েকটি প্রক্রিয়া রয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত ৮ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে প্রধান করে ৯ সদস্যের একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। 
জানা গেছে, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পে-স্কেল বাস্তবায়ন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হলে সচিব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এমন তথ্য জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। 
তিনি জানান, নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামোর সুপারিশ পর্যালোচনার কাজ চালিয়ে যাবে ৯ সদস্যের সচিব কমিটি। এই কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে এই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করেননি তিনি। মূলত গত ৮ ফেব্রুয়ারি গঠিত এই কমিটি জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর সুপারিশগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। 
আইএমএফের সতর্কতা ও ব্যয় সংকোচন 
সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এশীয় অঞ্চলের প্রধান কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন আপাতত পিছিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। 
আইএমএফের মতে, বৈশ্বিক অস্থিরতা ও ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে বাংলাদেশের মতো ভঙ্গুর অর্থনীতিতে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট তীব্র হতে পারে। এই মুহূর্তে বেতন বাড়ালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব হয়ে পড়বে। সরকার এই পরামর্শ আমলে নিয়ে বর্তমানে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি কেনা ও বিলাসী প্রকল্প বন্ধসহ কঠোর কৃচ্ছ্র সাধনের নীতি গ্রহণ করেছে। 
বাজেট বরাদ্দ নিয়ে ধোঁয়াশা ও কর্মচারীদের ক্ষোভ 
গুঞ্জন উঠেছে যে নতুন পে-স্কেলের জন্য বরাদ্দ থাকা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ-জ্বালানি ও ফ্যামিলি কার্ডের ভর্তুকি খাতে স্থানান্তর করা হয়েছে। এই খবরে ক্ষোভে ফুঁসছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। 
বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি গত ৫ এপ্রিল থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত ৬ দিনের কর্মসূচি পালন করছে। সংগঠনের আহ্বায়ক আব্দুল মালেক বলেন, “২০১৫ সালের পর আর বেতন বাড়েনি। নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় এখন আমাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। আমরা আগামী বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের দাবি জানাই।” 
সরকারি চাকরিজীবীদের পক্ষে সংগঠনটি বলেছে, বর্তমান বাস্তবতায় দ্রুত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি। 
বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মত 
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া সুপারিশ সরাসরি গ্রহণ না করে তা একটি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তিনি একটি আলাদা কমিশন গঠনের পরামর্শ দিয়ে বলেন, “আগের সরকারের নেওয়া উদ্যোগ বর্তমান সরকারের ওপর এক ধরনের ‘প্রলম্বিত দায়’ তৈরি করেছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অন্যায্য। 
এদিকে অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার অভয় দিয়ে বলেন, “সরকার পে-স্কেল দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সচিব কমিটি কাজ শুরু করেছে, এ নিয়ে দ্বিধায় পড়ার কোনও কারণ নেই। 
তবে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারের বর্তমান অনমনীয় অবস্থানে সহসাই নতুন বেতন কাঠামো আলোর মুখ দেখছে না। সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের দফতরে কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকবর হোসেন বলেন, “মনে হচ্ছে সহসাই বাস্তবায়ন হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ তো আমলে নিতে হবে। তিনি নিশ্চয়ই ভালো কিছু করবেন এটা আমাদের বিশ্বাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *