পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন বিধানসভা ভোট কোনো দলের কাছে ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, কারো কাছে ‘কুরসি’ দখলের, আবার কারো কাছে ‘অস্তিত্ব রক্ষার’।

কে জিতবে আর কে দ্বিতীয় নম্বরে দৌড় শেষ করে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে- তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। যারা রাজনীতি নিয়ে চর্চা করেন তাদের প্রায়শই বলতে শোনা যায়, ভোটের অঙ্কে উত্তর মেলানো সব সময় সহজ নয়।
কারণ নির্বাচন কখনো ইস্যুভিত্তিক, কখনো প্রার্থী-নির্ভর আর কখনোবা একেবারে অন্য সমীকরণ কাজ করে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটের এই সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব।
এদের কেউ এই ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, কেউ নিজে প্রার্থী নন, কেউ আবার এই রাজ্যের বাসিন্দাও না- কিন্তু নির্বাচনে কোনো না কোনোভাবে তারা উল্লেখযোগ্য ‘ফ্যাক্টর’।
কারা এই ব্যক্তি, কোন বিষয়গুলো তাদের পক্ষে যেতে পারে আর বিপক্ষেই বা কী যেতে পারে এক ঝলকে দেখে নেওয়া যাক।
ছবির ক্যাপশান,মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী নিজেই আসন্ন ভোট একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর
মমতা ব্যানার্জী
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা ব্যানার্জীকে প্রায়শই বলতে শোনা যায় রাজ্যের ২৯৪টা বিধানসভা কেন্দ্রে ‘তিনিই প্রার্থী’। তার দলের নেতা নেত্রীরাও বলে থাকেন যে তিনিই ‘এক এবং অদ্বিতীয়’ নেত্রী।
সংসদীয় গণতন্ত্রে তার সফর চার দশকেরও বেশি সময় ধরে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন মমতা ব্যানার্জী, সেই থেকে টানা ক্ষমতায় রয়েছেন তিনি।
গত কয়েক বছরে তার দলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দেখা গিয়েছে।
এই সমস্ত বিষয় মাথায় রেখে আসন্ন ভোটে লড়াই যে তার দলের জন্য খুব সহজ হবে না, এমনটা মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
এগিয়ে থাকার ফ্যাক্টর-
মুখ্যমন্ত্রী নন, ‘দিদি’ বলেই নিজের পরিচয় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে দীর্ঘদিন ধরেই সচেষ্ট তিনি। রাজ্যে নারী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তার কার্যকাল, জনসংযোগ, সংগ্রামী ভাবমূর্তি বরাবরই ভিন্ন ‘অ্যাপিল’ রেখেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে তিনি যে কঠোর অবস্থান নিতেও পিছপা হবে না তা বারবার জানান দিয়েছেন।
বিজেপির বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার তার দল। ভিন্ন রাজ্যে বাংলা বললেই বাংলাদেশী তকমা পেতে যাচ্ছে।
রাজ্যের প্রতি কেন্দ্রের বঞ্চনার মতো ইস্যু নিয়ে ক্রমাগত প্রচার করেছেন তিনি।
এসআইআর নিয়ে যেমন বিজেপিকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি, তেমনই আইনজীবী হিসাবে দিল্লি ছুটেছেন রাজ্যের মানুষের ‘পক্ষে সওয়াল করতে’। তার এই ‘পরিত্রাতার’ ভূমিকা নিয়েও ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস দল।
আবার বিশেষজ্ঞদের মতে, লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্য সাথী এবং সম্প্রতি যুবসাথীর মতো প্রকল্প আসন্ন ভোটে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিগত নির্বাচনগুলোতে তৃণমূল কংগ্রেসের জয়ের নেপথ্যে যে নারী এবং মুসলমান ভোটারদের একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে তা মনে করেন অনেকে। এই দুই ফ্যাক্টর আসন্ন ভোটেও নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
অসুবিধায় ফেলতে পারে যেসব কারণ-
বিভিন্ন দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ একাধিক অভিযোগের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-মন্ত্রীদের নাম জড়িয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্র এবং পৌরসভায় নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতি, রেশন দুর্নীতির মতো ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। দলের বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা-মন্ত্রী জেলেও গিয়েছিলেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগ সংক্রান্ত দুর্নীতির জেরে চাকরিহারারা বিক্ষোভে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানিয়েছেন যা জাতীয় স্তরে শিরোনামে এসেছে।
অন্যদিকে, কলকাতা, দুর্গাপুর, ধূপগুড়িসহ, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় নারীদের যৌন নির্যাতনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যে তোলপাড় হয়েছে। আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার তদন্তে সরকারের ভূমিকা এবং রাজ্যে নারী সুরক্ষা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
এই ইস্যুগুলো ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে যেতে পারে বলে মনে করেন অনেকে। পাশাপাশি দুর্নীতিতে নাম জড়িয়েছে এমন নেতাদের দলে ফেরানো এবং প্রার্থী করা নিয়ে বিরোধীরা তাকে কোণঠাসা করেছেন।
সূত্র :বিবিসি