নওগাঁয় জনপ্রিয়তার শীর্ষে ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট  অ্যাপ

শেয়ার করুন
নওগাঁ প্রতিনিধি                 ছবি :সকালের নিউজ

জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা আনতে সরকার যেখানে ‘ফুয়েল পাস’ চালু করেছে, সেখানে নওগাঁ জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে তৈরি স্থানীয় ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপটি সহজ ব্যবহার, দ্রুত সেবা ও কার্যকর নজরদারির কারণে বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

রাজধানী ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ ব্যবহারে গ্রাহকদের পূর্ব রেজিস্ট্রেশন, ইন্টারনেট সংযোগ এবং কিউআর কোড সংগ্রহ বাধ্যতামূলক। এতে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য জটিলতা তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাইভেট কারের ক্ষেত্রে মালিক ও চালকের ভিন্নতা থেকেও জটিলতার সুযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে গত ৯ এপ্রিল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে রাজধানীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে এই কার্যক্রম চালু হয়েছিল। তবে ফুয়েল পাস নিতে অ্যাপ ডাউনলোড করে নিবন্ধন করতে পারছেন না অনেকেই। গত রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে আগের চিত্রই দেখা গেছে।

পাম্পে তেল নিতে আসা ক্রেতারা বলছেন, ফুয়েল পাসের অ্যাপে প্রবেশ করা যাচ্ছে না, তাই আগের নিয়মেই তেল নিতে হচ্ছে। পাম্পের কর্মচারীরা বলছেন, সার্ভার জটিলতার কারণে ফুয়েল পাস বন্ধ রয়েছে। তাই আগের নিয়মেই তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, নওগাঁ জেলা প্রশাসন ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে তৈরি স্থানীয় ফুয়েল অ্যাপে গ্রাহকের কোনো রেজিস্ট্রেশনের প্রয়োজন হয় না। শুধুমাত্র ফিলিং স্টেশনের কর্মীর অ্যাকাউন্ট থেকেই পুরো ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়, ফলে ব্যবহার সহজ হয়েছে এবং সার্ভারে ডেটা লোডও কম থাকে।

এ অ্যাপের অন্যতম বিশেষত্ব হলো-লিটারের পাশাপাশি টাকার পরিমাণ ইনপুট দেওয়ার সুবিধা থাকায় খুচরা টাকার ঝামেলা কমে এবং দ্রুত জ্বালানি বিক্রি সম্ভব হয়। এছাড়া শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় তথ্য ইনপুট নেওয়ায় সার্ভারের ওপর চাপ কম থাকে।

ফুয়েল পাস অ্যাপে যেখানে দেশের প্রায় ৫৯ লাখ লাইসেন্সধারীর তথ্য সংরক্ষণ করতে হয়, সেখানে নওগাঁর অ্যাপে সারাদেশে সীমিত সংখ্যক (প্রায় ১০ হাজার) ফিলিং স্টেশন কর্মীর অ্যাকাউন্ট ব্যবহার হওয়ায় সার্ভার ঝুঁকি অনেকটাই কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

নওগাঁর অ্যাপে জ্বালানি নেওয়ার সময় বাধ্যতামূলকভাবে যানবাহনের মাইলেজ ইনপুট দিতে হয় এবং পরের বার জ্বালানি নিতে হলে তা হালনাগাদ করতে হয়। ফলে ব্যবহার ছাড়া জ্বালানি মজুদের সুযোগ থাকে না। একই সঙ্গে কৃষিযন্ত্র ও জরুরি সেবায় ব্যবহৃত জেনারেটরের জ্বালানি চাহিদাও এই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে।

এতে রয়েছে নাম্বার প্লেট স্ক্যানিং, রিয়েল-টাইম মনিটরিং, ফিলিং স্টেশনের ইনপুট-আউটপুট হিসাব এবং এআইভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্তকরণ ও অপরাধ প্রতিরোধেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

বর্তমানে নওগাঁর ৫৩টি, রাজশাহীর ৩৫টি পাবনার ৩২টি, জয়পুরহাটের ২০টি এবং বগুড়ার ২২টিসহ মোট ১৬২টি  ফিলিং স্টেশনে অ্যাপটি ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে নিবন্ধিত ফুয়েল কর্মী রয়েছে ৫৫৯ জন। এ পর্যন্ত প্রায় ৯০ হাজারের বেশি যানবাহন নিবন্ধিত হয়েছে, প্রায় ১ লাখের বেশি যানবাহনে তেল সরবরাহ করা হয়েছে। প্রায় ৫ লক্ষ ১০ হাজার লিটার জ্বালানি এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়েছে।

নিরব আহমেদ নামে এক মোটরসাইকেল চালক বলেন, “আমাদের কোনো রেজিস্ট্রেশন করতে হয় না, সরাসরি তেল নেওয়া যায়-এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা।” মোজাম্মেল হক নামে গ্রাহক জানান, “আগের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে বারবার তেল নেওয়ার সুযোগ নেই, ফলে সবার জন্য জ্বালানি নিশ্চিত হচ্ছে।”

নওগাঁ শহরের শাকিব ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার রুহুল আমিন বলেন, “আগে কাগজে হিসাব রাখতে হতো, এখন সবকিছু অ্যাপে হয়ে যাচ্ছে। সময় কম লাগছে, ঝামেলাও কমেছে।” মজুমদার ফিলিং স্টেশনের মালিক ব্রজেন মজুমদার জানান, “টাকায় ইনপুট দেওয়ার সুবিধা থাকায় গ্রাহকদের খুচরা টাকার সমস্যা কমেছে, ফলে সেবা দ্রুত দেওয়া যাচ্ছে।”

ফুয়েল ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশনটির ডেভেলপার আইসিটি অধিদপ্তরের প্রোগ্রামার বিপ্লব চন্দ্র সরকার জানান, অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েডের পাশাপাশি আইফোনেও ব্যবহারযোগ্য। এর মাধ্যমে জাতীয় বা স্থানীয় প্রশাসনের জ্বালানি বিতরণ সংক্রান্ত নতুন বা পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিলিং স্টেশন কর্মীদের সতর্কবার্তা হিসেবে প্রদর্শিত হয়।

বিপ্লব চন্দ্র সরকার আরও জানান, অ্যাপটির মাধ্যমে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলসহ সব ধরনের জ্বালানি বিভিন্ন যানবাহন, কৃষি যন্ত্র, জেনারেটর ও অন্যান্য যন্ত্রাংশে সরবরাহের তথ্য সংরক্ষণ করা যায়। জাতীয় পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য রোলভিত্তিক ড্যাশবোর্ড তৈরি করা হয়েছে, যেখানে ফিলিং স্টেশনের সন্দেহজনক রিফুয়েলিং তথ্যসহ সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। জেলা প্রশাসক নওগাঁর নির্দেশনা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি)-এর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে অ্যাপটি উন্নয়ন করা হয়েছে, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে জ্বালানি বণ্টন ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলকভাবে নিশ্চিত করা যায় এবং অবৈধ মজুদ রোধ করা সম্ভব হয়।

বিপ্লব চন্দ্র সরকার আরও উল্লেখ করেন, অ্যাপটির কারিগরি কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্বালানি ব্যবস্থাপনা সমাধান হিসেবে কাজ করবে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা ও জ্বালানির চাহিদা পূর্বাভাস দিতেও সক্ষম হবে।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মো. মাসুদুল হক বলেন, “আমরা এমন একটি সিস্টেম তৈরি করেছি যেখানে কম ডেটা ব্যবহার করেই সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যায়। মাইলেজভিত্তিক যাচাইয়ের কারণে জ্বালানি অপচয় ও মজুদ করার সুযোগ প্রায় নেই।”

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় তৈরি এই অ্যাপটি স্বল্প ব্যয়ে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে জ্বালানি খাতে অনিয়ম অনেকাংশে কমে আসবে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *