
ছবি সংগৃহীত:
রাজপথের আন্দোলন, তরুণদের সম্পৃক্ততা এবং বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির বার্তা দিয়ে যাত্রা শুরু করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচনে জোট রাজনীতির অংশ হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা যাচাই করতে এখন পর্যন্ত এককভাবেই এগোচ্ছে দলটি। এ কৌশলের অংশ হিসেবে ১২টি সিটি করপোরেশনে দলসমর্থিত প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর গতকাল দেশের ১০০ উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে আত্মপ্রকাশ করা এনসিপি।
দলটির নেতারা বলছেন, জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি তৃণমূল পর্যায়েও সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমাণ করতে চায় তারা। সেই লক্ষ্যেই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রার্থী ঘোষণা, নতুন মুখ দলে অন্তর্ভুক্তি এবং মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক বিস্তারে জোর দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীসহ জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আপাতত এককভাবেই এগোতে চায় এনসিপি। দলের নেতারা গণমাধ্যমকে স্পষ্ট করেছেন; স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তারা নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
জাতীয় নির্বাচনে যেখানে দলীয় আদর্শ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রক্ষমতার প্রশ্ন মুখ্য হয়ে ওঠে, সেখানে স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাররা বেশি গুরুত্ব দেন ব্যক্তির গ্রহণযোগ্যতা, সামাজিক সম্পর্ক, স্থানীয় উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবার সক্ষমতাকে। একজন মেয়র, উপজেলা চেয়ারম্যান কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানকে মানুষ বিচার করেন তিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে কতটা সম্পৃক্ত, সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছেন কিনা এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে কতটা কার্যকর সেই জায়গা থেকে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, জামায়াতে ইসলামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে অনেক আগ থেকেই সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে। দল হিসেবে সব সময় নির্বাচনের প্রস্তুতির মাঝে থাকি। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও একইভাবে প্রস্তুতি আছে। তিনি বলেন, তারা একক ও জোটগত দুই ধরনের প্রস্তুতিই রাখছেন। সমঝোতার বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হলেও রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সব ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি যাচাইয়ের বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে। দলটি বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের লক্ষ্য করে নতুন নেতৃত্ব সামনে আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের ১২ সিটি করপোরেশনে নিজেদের প্রার্থী, ১০০ উপজেলা ও পৌরসভায় দল সমর্থিত প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে এনসিপির দলীয় সূত্র থেকে জানা যায়, এনসিপিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে ভিন্ন মতও রয়েছে। দলটির একটি অংশ মনে করছে, জাতীয় নির্বাচনে জোটের অংশ হিসেবে থাকলেও এবার এককভাবে নির্বাচন করা উচিত, যাতে দলের প্রকৃত সাংগঠনিক সক্ষমতা ও জনসমর্থন যাচাই করা যায়। তাদের মতে, জামায়াতের সঙ্গে জোটে থাকলে এনসিপির স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় অনেকটাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে। আবার আরেক অংশ মনে করছে, স্থানীয় নির্বাচনে পুরোপুরি একক পথে হাঁটলে ভোট বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে ক্ষতির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম আমাদের সময়কে বলেন, আমরা যেমন এককভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি, একইভাবে জামায়াতও তাদের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে জোটগত সমঝোতার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা তরুণ, শিক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতে চাই স্থানীয় নির্বাচনে। যারা সমাজে সত্যিকার অর্থে দশের ও দেশের জন্য কাজ করবেন।
একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে উভয় দলই নিজেদের সাংগঠনিক অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। জামায়াত তৃণমূলভিত্তিক সংগঠনকে আরও সক্রিয় করছে, আর এনসিপি তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক বার্তা দিতে চাইছে। দুই দলই বুঝতে পারছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের লড়াই নয়; এটি রাজনৈতিক শক্তি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বেরও পরীক্ষা।