কেন খাবার পানিই হতে পারে উচ্চ রক্তচাপের কারণ

শেয়ার করুন

ছবি:সংগৃহীত

খাবারে অতিরিক্ত নুন খেলে রক্তচাপ বাড়ে- এ কথা আমাদের সবার জানা। তাই উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা সাধারণত পাতে নুন কম নিই, ব্যায়াম করি কিংবা ধূমপান ছেড়ে দিই।

কিন্তু জীবনযাত্রার এই চেনা ছকের বাইরেও একটি ভয়ংকর উৎস থেকে আমাদের শরীরে নুন ঢুকছে, যা নিয়ে আমরা সচরাচর ভাবিই না। সেটি হলো আমাদের প্রতিদিনের খাবার পানি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে, আর সেই নোনা পানি মিশে যাচ্ছে আমাদের মিষ্টি পানির উৎসে। ফলে অজান্তেই কোটি কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।রাজীব চৌধুরী ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ বিভাগের অধ্যাপক এবং একজন বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য গবেষক। তিনি বিশ্বব্যাপী হৃদরোগ ও পরিবেশগত ঝুঁকির প্রভাব নিয়ে কাজ করছেন। তার এ গবেষণাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য কনভারসেশন’-এ প্রকাশিত হয়েছে। অধ্যাপক রাজীব চৌধুরী ও তার গবেষক দল সম্প্রতি এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন। এই ফিচারে আমরা সেই গবেষণার সূত্র ধরে জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনস্বাস্থ্যের এক গভীর সঙ্কটের দিকটির বিশ্লেষণ প্রকাশ করছি।

উপকূলীয় জীবনে নোনা পানির থাবা
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ১০০ কোটিরও বেশি। হৃদরোগ ও স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপে। সাধারণত জনস্বাস্থ্য সচেতনতায় কেবল খাদ্যাভ্যাস বা শরীরচর্চায় গুরুত্ব দেয়া হয়, কিন্তু পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব এখানে উপেক্ষিত।

অধ্যাপক রাজীব চৌধুরীর মতে, খাবার পানি নোনতা হওয়ার কারণে বা ‘স্যালাইনিটি’ এখন একটি বড় পরিবেশগত ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে নোনা পানি মাটির নিচের স্তরে অর্থাৎ একুইফারে প্রবেশ করছে।

বিশ্বের প্রায় ৩০০ কোটির বেশি মানুষ উপকূলীয় অঞ্চলে বাস করেন। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানিই পান করা এবং রান্নার প্রধান উৎস। এই পানিতে যখন নুন মেশে, অনেক সময় তা মুখে টের পাওয়া যায় না। কিন্তু নিয়মিত এই পানি পানের মাধ্যমে মানুষের শরীরে অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রবেশ করছে, যা নিঃশব্দে রক্তচাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গবেষণার ফলাফল : অলস জীবনযাত্রার মতোই ঝুঁকিপূর্ণ
অধ্যাপক রাজীব চৌধুরী ও তার দল যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কেনিয়া ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের প্রায় ৭৪ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত ২৭টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। এই বিশাল ‘মেটা-অ্যানালাইসিস’ থেকে পাওয়া ফলাফল বেশ উদ্বেগজনক।বাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

দেখা গেছে, যারা তুলনামূলক নোনতা পানি পান করেন, তাদের সিস্টোলিক রক্তচাপ গড়ে ৩ দশমিক ২২ মিলিমিটার এবং ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ ২ দশমিক ৮২ মিলিমিটার বেশি থাকে।

সামগ্রিকভাবে, নোনা পানি পান করার ফলে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৬ শতাংশ বেড়ে যায়। গবেষকরা বলছেন, এই ঝুঁকির মাত্রা একজন মানুষের অলস বা শারীরিক পরিশ্রমহীন জীবনযাত্রার (সেডেন্টারি লাইফস্টাইল) ঝুঁকির প্রায় সমান। অলস জীবনযাত্রায় রক্তচাপের ঝুঁকি যেখানে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ বাড়ে, সেখানে নোনা পানি একাই ২৬ শতাংশ ঝুঁকি তৈরি করছে। যদিও ব্যক্তিগত পর্যায়ে রক্তচাপের এই বৃদ্ধি সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

স্বাস্থ্যনীতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ
মজার ব্যাপার হলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও বর্তমানে খাবার পানির সোডিয়ামের মাত্রার জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্বাস্থ্য-ভিত্তিক মানদণ্ড নির্ধারণ করেনি। অথচ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, উপকূলীয় মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্যের চেয়েও পানি অনেক সময় সোডিয়ামের বড় উৎস হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন যত ত্বরান্বিত হবে, উপকূলীয় মিষ্টি পানির উৎসগুলো তত বেশি নোনা হয়ে পড়বে। ফলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি পাল্লা দিয়ে বাড়বে।

গবেষক দলটির মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই নোনা পানি হার্ট অ্যাটাকের মতো ঘটনা কতটা বাড়াচ্ছে, তা নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে উপকূলীয় মানুষের উচিত তাদের এলাকার পানির গুণগত মান নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং সামগ্রিকভাবে খাবারে নুনের পরিমাণ কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখা। পানির এই অদৃশ্য লবণাক্ততা কেবল পরিবেশের সমস্যা নয়, এটি এখন বৈশ্বিক হৃদরোগ মহামারির এক নতুন অনুঘটক।

সূত্র: দ্য কনভারসেশন এবং ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির গবেষণা প্রতিবেদন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *