খুলে দেওয়া হলো হরমুজ প্রণালী,যুদ্ধ কোন পথে

শেয়ার করুন


ছবি :সংগৃহীত

ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর এবার হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, লেবাননে যুদ্ধবিরতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল যুদ্ধবিরতির অবশিষ্ট সময়ের জন্য সম্পূর্ণভাবে খুলে দেওয়া হয়েছে। জলপথটি ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার পূর্ব ঘোষিত সমন্বিত রুট অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
ইরানের এমন ঘোষণার পর এখন প্রশ্ন উঠছে এবার কি তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামবে?

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার এই ঘোষণা নতুন করে আশার আলো জাগালেও পরিস্থিতি এখনো জটিল এবং অনিশ্চিত। লেবাননে যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে ইরানের এই সিদ্ধান্ত কৌশলগত হলেও এটি কি সত্যিই বৃহত্তর সংঘাতের অবসানের ইঙ্গিত, নাকি সাময়িক বিরতি?
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট। ইরান এটি খুলে দিয়ে মূলত দুইটি বার্তা দিয়েছে। প্রথমত, তারা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চায়। দ্বিতীয়ত, এটি একটি কৌশলগত নমনীয়তা; যা দেখায়, তেহরান পুরোপুরি সংঘাত বাড়ানোর পথে হাঁটছে না।
তবে এই সিদ্ধান্তকে অনেক বিশ্লেষক ট্যাকটিক্যাল ডি-এস্কেলেশন হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ, এটি স্থায়ী শান্তির প্রতিশ্রুতি নয়; বরং চাপ কমিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার একটি পদক্ষেপ।

যদিও এরআগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে ও এ যুদ্ধ শিগগির শেষ হবে। একইসঙ্গে সম্ভাব্য একটি চুক্তির কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিষয় নয়। এতে ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির জড়িত থাকায় পরিস্থিতিকে বহুমাত্রিক সংঘাতের রূপ দিয়েছে। ফলে একক কোনো চুক্তি পুরো অঞ্চলে শান্তি আনতে পারবে; এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ বিষয়ে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তারা কোনো আংশিক বা অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না। তাদের লক্ষ্য লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত সব সংঘাতের একটি সমন্বিত ও স্থায়ী সমাধান।
তার এই অবস্থান থেকে বোঝা যায়, ইরান নিজস্ব নিরাপত্তার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখার কৌশল নিয়েই এগোচ্ছে। ফলে, তাদের সম্মতি ছাড়া বৃহত্তর শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।
মনে রাখতে হবে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, হরমুজ খুলে দেওয়া ও লেবাননে যুদ্ধবিরতি উত্তেজনা কমাতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ (২২ এপ্রিল পর্যন্ত) পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রিত রাখছে। তৃতীয়ত, গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও লোহিত সাগরে ছড়িয়ে থাকা সংঘাত এখনো অমীমাংসিত।
অর্থাৎ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু যুদ্ধ পুরোপুরি থামার সম্ভাবনা এখনই কম। বরং এটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি, পরিপূর্ণ শেষ নয়।
সুতরাং, স্থায়ী শান্তির জন্য প্রয়োজন বহুপাক্ষিক সংলাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান। যতদিন না সেই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হচ্ছে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ছায়া পুরোপুরি সরে যাবে এমন আশা বাস্তবসম্মত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *