বাঙালির প্রাণের পহেলা বৈশাখ উদযাপন

শেয়ার করুন

ছবি সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধপীড়িত অস্থিরতা, আশা-নিরাশার দোলাচল- সব কিছু ভুলিয়ে দিয়ে আজ বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। তাপস নিঃশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে উড়ায়ে দিতে, পুরনো বছরের আবর্জনা দূর করতে এসেছে নতুন দিন। দুঃখ-কষ্ট ভুলে, হতাশা-গ্লানি মুছে নবরূপে আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত হবে সবাই।

আজ মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সূর্যোদয়ের সঙ্গে শুরু হবে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের যাত্রা। বাংলা নববর্ষ কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা পরিবর্তনের দিন নয়, এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও আত্মপরিচয়ের পুনর্জাগরণের দিন।

‎প্রতি বছর ভোরের আলো ফোটার আগেই মানুষের ঢল নামে রাজধানীর রমনা উদ্যানে। সূর্যের প্রথম কিরণে শুরু হয় ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও প্রায় দুই শ শিল্পীর অংশগ্রহণে সুর, বাণী ও ছন্দের এক অপূর্ব সমন্বয়ে সাজানো হয়েছে এই আয়োজন। প্রকৃতি, মানবতা, দেশপ্রেম ও লোকজ জীবনের গান পরিবেশিত হবে।

‎এবারের অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে স্মরণ করা হচ্ছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রখ্যাত গণসংগীতজ্ঞ সলিল চৌধুরী ও পাকিস্তানবিরোধী আন্দোলনের গীতিকার-সুরকার মতলুব আলীকে।

‎সকাল ৯টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে বের হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। বিতর্ক এড়াতে এবার শোভাযাত্রার নাম থেকে ‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ শব্দ দুটি বাদ দেওয়া হলেও এর প্রাণবন্ততা ও তাৎপর্যে কোনো ঘাটতি নেই।

শোভাযাত্রার রুট: চারুকলা অনুষদের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে শাহবাগ, রাজু ভাস্কর্য, টিএসসি ও দোয়েল চত্বর ঘুরে পুনরায় চারুকলায় ফিরে এসে শেষ হবে। এ বছরের স্লোগান: ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’। পাঁচটি প্রধান মোটিফ- মোরগ (নতুন দিন, শক্তি), বেহালা (সৃজনশীলতা), পায়রা (শান্তি), হাতি (গৌরব) ও ঘোড়া (গতিময়তা)।

৩৫ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর পরিবেশনায় জাতীয় সংগীত, ‘এসো হে বৈশাখ’ ও বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান শোভাযাত্রাকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলবে। প্রায় দুই শ শিক্ষার্থী জাতীয় পতাকা বহন করে শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ১৩ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত পাঁচ দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে। আজ মূল আয়োজন হবে জাতীয় নাট্যশালায় বিকেল ৩টায়। থাকবে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, শতকণ্ঠে ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনা, কবিগান, গম্ভীরা ও বাউল গানের আসর।
পরবর্তী দিনগুলোতে থাকছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিবেশনা, অ্যাক্রোব্যাটিক প্রদর্শনী, ‘জাতি বৈচিত্র্যে বৈশাখী উৎসব’ এবং পুতুলনাট্য। সমাপনী দিনে নৃত্য, লোকসংগীত, ব্যান্ডসংগীত ও তারকা শিল্পীদের পরিবেশনার পাশাপাশি প্রদর্শিত হবে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’।

ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে চ্যানেল আই ও সুরের ধারার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘হাজারো কণ্ঠে বর্ষবরণ’। ভোর ৫টা ৩০ মিনিট থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলা এই আয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত শিল্পীরা অংশ নেবেন। একই সঙ্গে সেখানে বসেছে বৈশাখী মেলা, যেখানে মাটির তৈরি খেলনা, তৈজসপত্র, লোকজসামগ্রী এবং নাগরদোলাসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির নানা উপকরণ পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও সারা দেশের জেলা-উপজেলায় বৈশাখী মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।
‎রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৃথক বাণীতে দেশবাসী ও বিশ্বের সব বাংলাভাষী মানুষকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পহেলা বৈশাখকে জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক উল্লেখ করে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি কৃষি অর্থনীতিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

‎ইতিহাস ও স্বীকৃতি
মোগল সম্রাট আকবরের আমলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বাংলা সনের প্রবর্তন হয়। এটি ‘ফসলি সন’ থেকে ‘বঙ্গাব্দে’ রূপান্তরিত হয়ে বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

‎পাকিস্তান আমলে পহেলা বৈশাখ বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। ১৯৬৭ সালে ছায়ানটের উদ্যোগে রমনা বটমূলে প্রভাতী অনুষ্ঠান ছিল তৎকালীন সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং বাঙালির জাতিসত্তা পুনর্জাগরণের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। ১৯৮৯ সালে চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে শুরু হওয়া শোভাযাত্রা অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
২০১৬ সালে ইউনেসকো এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়- যা বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

পহেলা বৈশাখ শুধু দিন নয়, আবেগের নাম। পুরনো অভিযোগ ভুলে, সব বাধা পেরিয়ে নতুন প্রতিজ্ঞায় পথচলার নাম। আজ বাঙালির প্রাণের দিন। ঘরে ঘরে উৎসব। দেশপ্রেম আর বাঙালিয়ানার এক অনবদ্য মেলবন্ধন পহেলা বৈশাখ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *