
সাকিফ শামীম
চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল এন্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার
বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে একটি রূপান্তরমুখী সময়ে অবস্থান করছে। এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়ায় আমরা যেমন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি, তেমনি আমাদের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রবৃদ্ধির হার ধরে রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানো এবং সেই রাজস্ব ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও টেকসই করে তোলাও এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থার গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা সম্ভাবনাময় হলেও এর বর্তমান কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর নয়। আইনগত জটিলতা, সংজ্ঞাগত অস্পষ্টতা এবং প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা—এই তিনটি বিষয় ভ্যাট ব্যবস্থার কার্যকারিতাকে সীমিত করে রেখেছে। এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমরা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (সিএসইআর)-এর পক্ষ থেকে বাজেট ২০২৬–২০২৭ উপলক্ষে একটি প্রস্তাবনা তৈরি করেছি, যেখানে ভ্যাট ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট তুলে ধরছি:
প্রস্তাব-001: “অনুসন্ধান” (Investigation) এর একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এটি কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা বাড়াবে এবং তদন্ত কার্যক্রমে আইনি জটিলতা কমাবে।
প্রস্তাব-002: “Money” এর সংজ্ঞায় gift voucher অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব।
এটি ভুলভাবে ভ্যাট আরোপ প্রতিরোধ করবে এবং ডিজিটাল লেনদেনে স্পষ্টতা আনবে।
প্রস্তাব-003: “Economic Activity” সংজ্ঞা সম্পূর্ণভাবে বাতিলের প্রস্তাব।
এটি ভ্যাট আইনকে supply-based কাঠামোয় রূপান্তর করার একটি বড় পদক্ষেপ, যা বাস্তবমুখী।
প্রস্তাব-004: “Import” এর সংজ্ঞা সংশোধন করে পণ্য ও সেবা উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব।
ডিজিটাল ও সেবা-নির্ভর অর্থনীতির সাথে এটি সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
প্রস্তাব-005: “Electronic Service” এর সংজ্ঞা আইন থেকে সরিয়ে SRO-তে একীভূত করার প্রস্তাব।
এটি আইনের পুনরাবৃত্তি কমিয়ে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াবে।
প্রস্তাব-006: “Input” সংজ্ঞা থেকে “service” শব্দ বাদ দেওয়ার প্রস্তাব।
এটি ইনপুট ক্রেডিট ব্যবস্থাকে বাস্তবসম্মত করবে এবং ভুল ব্যাখ্যা কমাবে।
প্রস্তাব-007: নির্দিষ্ট টার্নওভারের (৩ কোটি টাকা) বেশি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তি।
এটি ট্যাক্স নেট সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং রাজস্ব বাড়াবে।
প্রস্তাব-008: “Tax Fraction” এর সংজ্ঞা সহজ ও স্পষ্টভাবে পুনর্গঠন।
এটি ভ্যাট হিসাবকে সহজ করবে, বিশেষ করে VAT-inclusive মূল্যের ক্ষেত্রে।
প্রস্তাব-009: “Tax Benefit” সংজ্ঞা বাতিলের প্রস্তাব।
অপ্রয়োজনীয় সংজ্ঞা বাদ দিলে আইন আরও সহজবোধ্য হবে।
প্রস্তাব-010: “Tax Invoice” সম্পর্কিত ডুপ্লিকেট সংজ্ঞা বাতিল।
ডকুমেন্টেশন সহজ হবে এবং বিভ্রান্তি কমবে।
প্রস্তাব-011: “Turnover” সংজ্ঞা পুনর্গঠন।
এটি ভ্যাট নিবন্ধন ও বাধ্যবাধকতা নির্ধারণে স্পষ্টতা আনবে।
প্রস্তাব-012: “Audit” এর সংজ্ঞা যুক্ত করা।
কর নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় একরূপতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
প্রস্তাব-013: Export of services এর সংজ্ঞা সম্প্রসারণ (non-resident সুবিধাভোগী অন্তর্ভুক্তি)।
এটি আন্তর্জাতিক সেবা রপ্তানিকে উৎসাহিত করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হবে।
প্রস্তাব-014: “Increasing Adjustment” (সমন্বয়) সংজ্ঞা পুনর্গঠন।
এটি ভ্যাট সমন্বয় প্রক্রিয়াকে আরও যৌক্তিক ও ট্র্যাকযোগ্য করবে।
বর্তমান ভ্যাট আইনের দিকে তাকালে প্রথমেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো এর জটিলতা। অনেক ক্ষেত্রে আইনটি এমনভাবে গঠিত হয়েছে, যা বাস্তব ব্যবসায়িক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, “economic activity” বা অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সংজ্ঞাটি অত্যন্ত বিস্তৃত এবং অনেকাংশে তাত্ত্বিক। বাস্তবে কর নির্ধারণের ক্ষেত্রে এটি খুব বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে না, বরং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
আমার দৃষ্টিতে, ভ্যাট একটি লেনদেনভিত্তিক কর। এখানে মূল বিষয় হওয়া উচিত “supply” বা সরবরাহ—অর্থাৎ পণ্য বা সেবার প্রকৃত বিনিময়। তাই আমরা প্রস্তাব করেছি, এই ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও জটিল সংজ্ঞা বাদ দিয়ে একটি সরল, সরবরাহভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলা হোক। এতে করে আইনটি যেমন সহজবোধ্য হবে, তেমনি এর প্রয়োগও আরও কার্যকর হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো সংজ্ঞার অস্পষ্টতা। বাস্তবে আমরা প্রায়ই দেখি, একই বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়, যা কর নির্ধারণে জটিলতা তৈরি করে। “money”, “import”, “electronic services” এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে স্পষ্টতা না থাকলে পুরো কর ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই জায়গা থেকে আমরা প্রস্তাব করেছি, “money” এর সংজ্ঞায় gift voucher অন্তর্ভুক্ত করা হোক, যাতে এটি ভুলভাবে পণ্য বা সেবা হিসেবে বিবেচিত না হয়। একইভাবে “import” এর সংজ্ঞায় সেবাকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, কারণ বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল ও সেবা-নির্ভর অর্থনীতি দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
এছাড়া “electronic services” সম্পর্কিত বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন সংজ্ঞাকে একত্রিত করে একটি একক কাঠামোর মধ্যে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে করে আইনের ভেতরে সামঞ্জস্যতা তৈরি হবে এবং কর প্রশাসনের কাজ সহজ হবে।
ভ্যাট ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করে কর গণনার সহজতার ওপর। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, VAT-inclusive মূল্য থেকে কর নির্ধারণ করা অনেক ব্যবসায়ীর জন্য জটিল হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে ভুল হিসাব, বিলম্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিচ্ছাকৃত অনিয়ম ঘটে।
আমরা সিএসইআর-এর পক্ষ থেকে একটি মানসম্মত ও সহজ সূত্র প্রস্তাব করেছি, যা অনুসরণ করলে ব্যবসায়ীরা সহজেই কর নির্ধারণ করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস, কর গণনা যত সহজ হবে, ততই স্বেচ্ছায় কর প্রদানের প্রবণতা বাড়বে এবং কর প্রশাসনের ওপর চাপ কমবে।
বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনও ভ্যাটের আওতার বাইরে রয়েছে। এটি শুধু রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়, বরং একটি অসম প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমাদের প্রস্তাবনায় নির্দিষ্ট টার্নওভার সীমার ওপরে থাকা ব্যবসাগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে ভ্যাট ব্যবস্থার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, অনিবন্ধিত ব্যবসাগুলোকে উৎসাহিত করতে সীমিত সময়ের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।
আমি মনে করি, এখানে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে হবে। তারা যদি বুঝতে পারেন যে এই ব্যবস্থা তাদের জন্য সহায়ক, তাহলে তারা স্বেচ্ছায় এর আওতায় আসবেন।
বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল প্রযুক্তি ছাড়া কোনো কর ব্যবস্থা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)-এর ব্যাপক ব্যবহার আমাদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
আমরা প্রস্তাব করেছি, এমএফএস-এর মাধ্যমে সরাসরি সরকারি হিসাবে ভ্যাট জমা দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা হোক। এতে করে রাজস্ব সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ হবে, স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতি ও ফাঁকি কমবে। আমার দৃষ্টিতে, ডিজিটালাইজেশন একটি সিস্টেমিক পরিবর্তন, যা পুরো কর ব্যবস্থাকে আধুনিক ও দক্ষ করে তুলতে পারে।
সব খাতের জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য করলে অনেক সময় সমস্যা তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, বীমা খাতে প্রকৃত মূল্য সংযোজন নির্ধারণ একটি জটিল বিষয়, যা সাধারণ পণ্য বা সেবার মতো নয়। এই কারণে আমরা adjustment পদ্ধতির উন্নয়ন প্রস্তাব করেছি, যাতে শুধুমাত্র প্রকৃত মূল্য সংযোজনের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়। একইভাবে আন্তর্জাতিক সেবার ক্ষেত্রে কর আদায় নিশ্চিত করতে non-resident প্রতিষ্ঠানের জন্য ভ্যাট এজেন্ট নিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের খাতভিত্তিক বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া হলে ভ্যাট ব্যবস্থা আরও কার্যকর এবং গ্রহণযোগ্য হবে।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, অতিরিক্ত জটিলতা এবং কঠোরতা ব্যবসার গতি কমিয়ে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিয়মকে উৎসাহিত করে। আবার অতিরিক্ত শিথিলতা রাজস্ব ক্ষতির কারণ হয়। তাই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদ্ধতি প্রয়োজন, যেখানে কর আদায় এবং ব্যবসার বিকাশ—দুটোকেই সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিএসইআর-এর প্রস্তাবনায় আমরা এই ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছি—যেখানে আইন সহজ, প্রয়োগ স্বচ্ছ, এবং ব্যবসার জন্য পরিবেশ সহায়ক।
বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা সংস্কারের এখনই উপযুক্ত সময়। আমরা যদি এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারি, তাহলে শুধু রাজস্ব বৃদ্ধি নয়, বরং একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং টেকসই অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সিএসইআর-এর পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে ভ্যাট ব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এখন প্রয়োজন নীতিনির্ধারকদের দূরদৃষ্টি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন।