জলবায়ু ঝুঁকি: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা থেকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজন

শেয়ার করুন

সাকিফ শামীম, FACHE, FLMI
অর্থনীতিবিদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ল্যাবএইড ক্যান্সার হাসপাতাল অ্যান্ড সুপার স্পেশালিটি সেন্টার
উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, ল্যাবএইড গ্রুপ

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে পরিচিত। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতিপূর্ণ জনসংখ্যা, নদীভিত্তিক জীবনযাপন এবং বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এখন আর বিচ্ছিন্ন দুর্যোগ নয়; বরং এসব ঘটনা ধীরে ধীরে দেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং নগর ব্যবস্থাপনার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। তাই জলবায়ু ঝুঁকিকে কেবল দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, এখনই কার্যকর জলবায়ু অভিযোজন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার মাত্রা বাড়ার ফলে কৃষি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় ধান ও সবজি উৎপাদন কমে গেছে, ফলে জীবিকার সন্ধানে অনেক মানুষ শহরমুখী হচ্ছেন।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি পর্যায়ে প্রস্তুতির কারণে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত সতর্কতা ও প্রস্তুতির কারণে প্রাণহানি অনেক কম হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি দেশের একটি বড় অর্জন।

তবে বর্তমান বাস্তবতা দেখায় যে শুধু দুর্যোগ মোকাবিলা যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তন এখন অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য এবং নগরায়নের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। ফলে জলবায়ু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত করা অত্যন্ত জরুরি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে জলবায়ু বিষয়টি ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাতীয় বাজেটের প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জলবায়ু সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয় করা হচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান অর্থায়ন এখনও পর্যাপ্ত নয়।

অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও জলবায়ু ঝুঁকিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। সড়ক, সেতু, বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শিল্পাঞ্চল নির্মাণের সময় যদি জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে এসব প্রকল্প টেকসই নাও হতে পারে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে “জলবায়ু সহনশীলতা” নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কৃষি খাতেও একই ধরনের রূপান্তর প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪০ শতাংশই কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কৃষি উৎপাদনের ধরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাই লবণসহিষ্ণু ফসলের সম্প্রসারণ, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি পদ্ধতির প্রসার জরুরি। একই সঙ্গে কৃষকদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি বীমা চালুর বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

জলবায়ু ঝুঁকি নগর অর্থনীতির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। গ্রামীণ জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরে চলে আসছে। এর ফলে বিশেষ করে ঢাকার মতো বড় শহরগুলোর অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং বিকেন্দ্রীকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে অধিকাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের জন্য দায়ী হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। তাই জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করা বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের নৈতিক দায়িত্ব। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতা। যদি একে শুধুমাত্র দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই এখনই সময় জলবায়ু ঝুঁকিকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করার।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কয়েকটি বাস্তবমুখী নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন—

প্রথমত, জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপে জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। বড় কোনো অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল বা উন্নয়ন প্রকল্প শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বন্যার সম্ভাবনা, লবণাক্ততার মাত্রা এবং তাপমাত্রা পরিবর্তনের মতো ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। উপকূলীয় বাঁধ, টেকসই সড়ক, জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বন্যা সহনশীল নগর অবকাঠামো গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, কৃষি খাতে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের দ্রুত বিস্তার প্রয়োজন। লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ এলাকায় উপযোগী নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন করতে হবে। স্মার্ট সেচব্যবস্থা এবং ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবা কৃষকদের উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু বীমা চালু করা হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর কৃষকরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।

চতুর্থত, বড় শহরগুলোর ওপর চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকৃত অর্থনৈতিক উন্নয়ন জরুরি। জেলা ও আঞ্চলিক শহরগুলোতে শিল্প, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ালে ঢাকামুখী অভিবাসন কমবে। পাশাপাশি টেকসই নগর পরিকল্পনা, সবুজ অবকাঠামো এবং উন্নত পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

পঞ্চমত, জলবায়ু অর্থায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে শক্তিশালী সহযোগিতা গড়ে তুলতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই শিল্প উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অর্থ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশের কৌশলগত সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।

সবশেষে, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা ও গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারকদের যৌথ উদ্যোগে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আরও বাস্তবসম্মত, সহনশীল এবং টেকসই করে তুলবে।


 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *