
ছবি :সকালের নিউজ।
কুরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আত্মত্যাগ, ভালোবাসা ও আনুগত্যের এক মহান ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ মাস এলেই মুসলিম পরিবারগুলোতে কুরবানি নিয়ে নানা মাসআলা ও প্রশ্ন সামনে আসে। তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন হলো— স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যদি সামর্থ্যবান হন, তাহলে কি দুজনের পক্ষ থেকেই আলাদা আলাদা কুরবানি করা ওয়াজিব? নাকি একজনের কুরবানিই উভয়ের জন্য যথেষ্ট?
ইসলামি শরিয়ত এ বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছে। কুরবানি এমন একটি ইবাদত, যা ব্যক্তিগত সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব হবে, তাকে নিজ দায়িত্বেই তা আদায় করতে হবে। নিচে বিষয়টি কুরআন-হাদিসের আলোকে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো—
কার ওপর কুরবানি ওয়াজিব?
প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানসম্পন্ন ও মুকিম (যিনি মুসাফির নন) মুসলমানের ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব, যদি তিনি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন।
১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাড়ে সাত তোলা সোনা অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা কিংবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা সম্পদ থাকে, তার কোরবানি করা আবশ্যক। বর্তমানে সোনা ও রুপার মূল্যের পার্থক্যের কারণে রুপার নিসাবকেই (৫২.৫ তোলা) মাপকাঠি হিসেবে ধরা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
‘অতএব তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় কর এবং কুরবানি কর।’ (সুরা আল-কাউসার: আয়াত ২)
এই আয়াতে কুরবানির নির্দেশ সামর্থ্যবান প্রত্যেক মুসলমানের জন্য প্রযোজ্য।
স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সামর্থ্যবান হলে করণীয়—
স্বামী ও স্ত্রী যদি আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে উভয়ের ওপর পৃথকভাবে কুরবানি করা ওয়াজিব। স্বামীর কুরবানি স্ত্রীর জন্য যথেষ্ট হবে না এবং স্ত্রীর কুরবানিও স্বামীর জন্য যথেষ্ট হবে না। কারণ কুরবানি ব্যক্তি ভিত্তিক ইবাদত। যার সম্পদ আছে, দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
‘যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে কুরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।’ (ইবনে মাজাহ ৩১২৩)
স্ত্রীর অলংকার থাকলেও কি কোরবানি ওয়াজিব?
অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীর কাছে নগদ টাকা না থাকলেও সোনা বা রুপার অলংকার থাকে। যদি ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত সোনা-রুপার সম্মিলিত মূল্য নিসাব পরিমাণ হয়, তবে ওই স্ত্রীর ওপর কুরবানি করা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ অলংকার ব্যবহার করা হলেও যদি তা নিসাব পরিমাণ সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে কুরবানির বিধান প্রযোজ্য হবে।
সামর্থ্যবান স্বামী-স্ত্রীর কুরবানি আদায়ের পদ্ধতি
স্বামী ও স্ত্রী দুজনই সামর্থ্যবান হলে দুটি আলাদা ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা কুরবানি দিতে হবে। আর গরু বা উটের মতো বড় পশুতে সাতজন পর্যন্ত শরিক হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী একটি গরুর দুটি আলাদা অংশে (শেয়ারে) শরিক হয়ে কুরবানি দিতে পারেন। এতে উভয়ের ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সঙ্গে শরিকে কুরবানি করার অনুমতি দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে—
نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ
আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানি করেছি।’ (মুসলিম ১৩১৮)
স্বামী কি স্ত্রীর কুরবানি আদায় করে দিতে পারেন?
শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, কুরবানি মূলত যার সম্পদ তার ওপরই অর্পিত দায়িত্ব। তবে স্ত্রী যদি সামর্থ্যবান হন এবং স্বামী নিজের অর্থ দিয়ে স্ত্রীর পক্ষ থেকে কুরবানি আদায় করে দিতে চান, তবে স্ত্রীর অনুমতি সাপেক্ষে তা জায়েজ হবে এবং স্ত্রীর কুরবানি আদায় হয়ে যাবে। অর্থাৎ কুরবানির দায়িত্ব স্ত্রীর ওপর থাকলেও স্বামী সহযোগিতা করতে পারেন।
কুরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, তাকওয়া ও আত্মসমর্পণের এক মহান নিদর্শন। ইসলাম প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তিকে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের শিক্ষা দেয়। তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে উভয়ের পক্ষ থেকেই পৃথকভাবে কুরবানি আদায় করা ওয়াজিব।
আমাদের উচিত কুরবানিকে শুধু সামাজিক রীতি হিসেবে না দেখে, ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আদায় করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে কুরবানির বিধান বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।