ছবি :সংগৃহীত
বিশ্বের পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাতারে যুক্ত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এ পারমাণবিক জ্বালানি ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ যাত্রার সূচনা হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ।
মঙ্গলবার বিকেলে পদ্মা তীরবর্তী এই মেগা প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপত্তাই এখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিভিন্ন ধাপের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০২৭ সালের জানুয়ারি নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। তবে এর আগেই চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট থেকে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ সরবরাহের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, এই উদ্যোগ দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার হবে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বাংলাদেশকে ভবিষ্যতেও পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালিত হবে।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি এই অগ্রযাত্রাকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেন।
* যেভাবে কাজ করবে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইউরেনিয়াম জ্বালানি ব্যবহার করে ‘নিউক্লিয়ার ফিশন’ প্রক্রিয়ায় তাপ উৎপন্ন করা হবে। সেই তাপে পানি বাষ্পে রূপান্তরিত হয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। প্রথম ইউনিটে একসঙ্গে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে, যা প্রায় ১৮ মাস পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম।
জ্বালানি লোডিং প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও রি-অ্যাক্টর চালু করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সব মিলিয়ে পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে সময় লাগতে পারে প্রায় ১০ মাস।
* জ্বালানি ও ব্যয় কাঠামো
রূপপুর প্রকল্পটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অবকাঠামো প্রকল্প, যার ব্যয় প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। এর অধিকাংশ অর্থ ঋণ হিসেবে দিচ্ছে রাশিয়া, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিশোধ করতে হবে। নির্মাণ চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম তিন বছর জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া।
* পরিবেশ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কার্বন নিঃসরণ খুবই কম হওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎস হিসেবে বিবেচিত। রূপপুর কেন্দ্র চালু হলে কয়লা ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
* নিরাপত্তা ব্যবস্থায় জোর
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় এখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মান বজায় রাখা হচ্ছে। আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের রি-অ্যাক্টর প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হবে।
* দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাস্তবায়ন
ষাটের দশকে শুরু হওয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্বপ্ন বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে প্রকল্পটি নতুন গতি পায় এবং ২০১৬ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দিগন্তই উন্মোচন করেনি, বরং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার আরেকটি শক্ত ভিত্তি স্থাপন করেছে।